Mukti

মুক্তিযুদ্ধের ছায়াছবি

Posted in movies by jrahman on March 31, 2010

এই লেখা মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে, একজন সচেতন দর্শকের দৃষ্টি থেকে । আশা করি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ভাল লাগবে ।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্রের পর্দায় ভালভাবে তুলে ধরা খুব একটা সহজ নয় ।  চিন্তা করুন একবার কতগুলি মাত্রা (মানে dimension) জড়িত ।  যুদ্ধের পটভূমি নিশ্চয়ই দেখান উচিত, কিন্তু কতটা ভূমিকা থাকবে ?  কেবলই যুদ্ধের কাহিনী হলেও দেখুন কতকিছু আসতে পারে ।  যুদ্ধের শুরু ঢাকায়, ২৫শে মার্চে ।  কিন্ত যুদ্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পরে সারা দেশে ।  প্রথমে পাকবাহিনী আক্রমণ করে জেলা শহরগুলি, তারপর গ্রাম ।  সবখানে চলে গণহত্যা ।  আর এই আক্রমণের সাথে সাথে কোটি মানুষ বাধ্য হয় ঘর ছেড়ে যেতে — প্রথমে ঢাকা ছেড়ে মফসসল, তারপর গ্রাম, এবং অনেকে গ্রাম ছেড়ে ভারত ।  আর একই সাথে ঘটে প্রতিরোধ — প্রথমে বিদ্রোহ, তারপর সংগঠন, আর তারপর পাল্টা আঘাত ।  বছর শেস হয়ে আসে আর এগিয়ে আসে বিজয় । 

এত কিছু একসাথে দেখাতে গেলে দরকার বিশাল production, অনেক বাজেট (বাংলা একাডেমী অভিধানে budget একটি বাংলা শব্দ) ।  আর সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু এভাবে চিন্তা করুন — যুদ্ধের শুরু মার্চে, গরম পরেনি তখনো, আর শেষ ডিসেম্বরের ঠান্ডায়, মাঝে বর্ষা ও শরত, নয় মাসের যুদ্ধ দেখাতে হলে ছবি তুলতে হবে তিন চার বার আলাদা আলাদা ভাবে, কারন আমাদের দেশের রূপ একেক ঋতুতে একেক রকম ।  এই কথা গুলি বলেছিলেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের একটি সাক্ষাতকারে বেশ কয়েক বছর আগে ।  

দেশ স্বাধীন হবার পরপরই কিছু চেষ্টা হয় সমগ্র যুদ্ধটি পর্দায় তুলে ধরার ।  মাসুদ পারভেজ ও চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন এই চেষ্টা গুলির মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে নামকরা ।  দুই নির্মাতা, এবং জড়িত সবার প্রতি — যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন —  যথেষ্ট সন্মান দেখিয়েও বলা যায় যে এই ছবিটি দেখলেই তারেক মাসুদ যা বলেছেন তার যৌক্তিকতা বোঝা যাবে ।

এবং সেই জন্যই পরবর্তি প্রজন্মের চলচ্চিত্রকাররা সমগ্র যুদ্ধ বাদ দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়্ নিয়ে কাজ করেছেন ।  তারেক মাসুদের নিজের নামকরা ছবি মাটির ময়নাতে যুদ্ধ সরাসরি এসেছে গ্রামে পাকবাহিনীর আক্রমণ দিয়ে, কিন্তু ছবিটির পটভূমিকায় আছে বাঙ্গালী মুসলমানের আত্মপরিচয়, আছে বাংলার ইসলামের নানা রূপ । 

গত কয়েকবছরের আরেকটি দর্শকনন্দিত যুদ্ধের ছবি হল তৌকির আহমেদের জয় যাত্রা  ।  এখানে যাত্রা হল স্বাধীন বাংলা’র উদ্দেশ্যে, যাত্রা’র শুরু গ্রামে পাকবাহিণীর গণহত্যা দিয়ে, শেষ মুক্তাঞ্চলে ।  একই ধরণের কাহিনী হল হুমায়ুন আহমেদের শ্যামল ছায়া, আর একই পরিচালকের আগুনের পরশমনিতে এসেছে মুক্তিবাহিনীর ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধ ।

কিছুদিন আগে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রথম আলোয় মুক্তিযুদ্ধের ছবির ওপর লিখেছিলেন ।  পাঠক, পুরো লেখাটি অবশ্যই পড়ুন, আমি কেবল যুদ্ধোত্তর ছবিগুলির নাম দিচ্ছি ।

  • ফখরুল আলমের জয়বাংলা
  • চাষী নজরুল ইসলামের ওরা এগারো জন
  • সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী
  • আনন্দের বাঘা বাঙালী
  • মমতাজ আলীর রক্তাক্ত বাংলা
  • আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা
  • নারায়ণ ঘোষ মিতার আলোর মিছিল
  • হারুন-অর-রশীদের মেঘের অনেক রং
  • শহীদুল হক খানের কলমীলতা
  • খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ

মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে, এবং নাটকে, যে সময়টা সাধারণত উপেক্ষিত থাকে তা হল যুদ্ধের শেষ কয়েক মাস ।  অবরুদ্ধ ঢাকাতেই বলুন আর সীমান্তের উদবাস্তু শিবিরেই হোক, অক্টোবরের শেষ থেকেই এটা স্পষ্ট হচ্ছিল যে বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানের দখল শিথিল হয়ে আসছিল ।  নভেম্বরের শেষে ছিল সারাদেশে মুক্তিবাহিনীর সাড়াশী আক্রমন ।  বোঝা যাচ্ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আসন্ন ।  কেমন ছিল সেই দিন গুলি ?  কেমন কেটেছে পাকবাহিণী আর আল বদরদের নজরদারির মধ্যে একাত্তরের রমযান (অক্টোবর-নভেম্বর) ?  কি ছিল ঘরছাড়া কোটি মানুষের অবস্থা ?  কসবা ও হিলি’র যুদ্ধে (অক্টোবর-নভেম্বর)  বিজয়ের পর মুক্তিবাহিনীর মনোবল কতটা বেড়েছিল ?  ভারতীয় যুদ্ধ বিমান আকাশে দেখে ঢাকাবাসীর কেমন লেগেছিল ?  কেমন ছিল সেই দিনটি যেদিন মুক্ত হল যশোর, কুমিল্লা, রংপুর ?  কেমন ছিল ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ — ঢাকায়, জেলা শহরগুলিতে, গ্রামে, সীমানার ওপারে ?

কোন চলচ্চিত্রকার কি তুলে ধরবেন এই দিন গুলি পর্দায় ?

আর টাকার অভাবে কি সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ কোনদিনই আমরা বড় পর্দায় দেখতে পারব না ?

অনেকে হয়ত বলবেন সরকারী সাহায্যের কথা ।  আমি সেই দলে নাই । 

সরকারের কি দায়িত্ব নাই এগিয়ে আসার, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ?  অবশ্যই আছে ।  কিন্তু আমি তো ইতিহাস শিক্ষার কথা বলছি না ।  আমি বলছি সৃজনশীল শিল্পের কথা ।  সরকারী আমলারা হয়ত ‘সত্য’ ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যসূচি বানাতে পারেন, কিন্তু শিল্প সাহিত্যের মধ্যে তাদের যত কম আনা যায় ততই ভাল — দলীয় রাজনীতির দলীয় ইতিহাসের কথা না হয় বাদই দিলাম ।

তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোন মহাকাব্যিক (মানে epic) ছবি হবে না ? 

হতে হলে বেসরকারী খাতকে এগিয়ে আসতে হবে ।  কিন্তু, কোন নির্মাতা এমন একটি প্রকল্পে টাকা খাটাবেন কি — ঝুঁকি টা কি অনেক বেশী নয় ?  ঝুঁকি তো অনেক বটেই, তবে তা কিছুটা হলেও লাঘব হবে যদি কাহিনী যথেষ্ট যুতসই হয় ।

সৌভাগ্যক্রমে সেরকম চিত্রনাট্যের উপযোগী অন্তত দুটি  কাহিনী আছে । 

প্রথমটি সত্য ঘটনা, গত বিশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কে সমুন্নত রাখছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে ।  এই কাহিনী হল অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর ।  এই কাহিনী হল গেরিলা বাহিনীর ।  প্রিয় পাঠক, আমি বলছি জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিন গুলির কথা ।

দ্বিতীয়টি উপন্যাস, ইংরেজীতে লেখা, এই সেদিন ।  লেখিকা যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের, এবং বিষয় বস্তুতে আছে প্রজন্ম পরিবর্তনের চিহ্ন । কিন্তু এখানেও আছে দখলীকৃত ঢাকা, গেরিলাদের কথা, আরো আছে মুজিবনগর (কলকাতার থিয়েটার রোড) ।  আর সবথেকে বড় কথা হল, এই বইএর চেতনা আর প্রথমটির একই ।   আমি বলছি তাহনিমা আনামের A golden age এর কথা ।

এই দুটি ছাড়াও আরো উপন্যাস ও নাটক আছে — আসুন দেখি হাবিবুর রহমান সাহেব কি তালিকা করেছেনঃ

  • উপন্যাসঃ মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন, খেলাঘর; রশীদ হায়দারের খাঁচায়, রিজিয়া রহমানের একটি ফুলের জন্য; ইমদাদুল হক মিলনের কালো ঘোড়া, পরাধীনতা
  • আত্মজৈবনিক রচনাঃ আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত; শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায়
  • নাটকঃ সৈয়দ শামসুল হকের যুদ্ধ এবং যুদ্ধ; আবদুল্লাহ আল-মামুনের এখনও ক্রীতদাস; মমতাজউদ্দীন আহমদের রাজা অনুস্বারের পালা

কোন নির্মাতা কি এগিয়ে আসবেন না সাহস করে, কোন চলচ্চিত্রকার কি তুলে ধরবেন না এই epic কাহিনী গুলি বড় পর্দায় ? 

—-

২০০৮-এর একটি লেখার উপর ভিত্তি করে ।  নিয়মিত পাঠক জানবেন এই ব্লগারের কল্পনার ফানুস, একাত্তরের যুদ্ধের ছবি (দেখুন এখানে এবং এখানে) ।

Tagged with:

2 Responses

Subscribe to comments with RSS.

  1. […] (দেখুন মুক্তি ব্লগে) […]

  2. […] it’s not obvious from my writing, I like movies.  I don’t think there is any movie on 1971 that one can call a classic.  And there isn’t a single movie that captures the war element […]


Comments are closed.

%d bloggers like this: