Mukti

নব্যরাজাকারবাদ থেকে এন্টি এন্টি-শর্মিলাবাদ

Posted in history, people by mehomaan on September 8, 2011

দেশ যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারে সোচ্চার, আর শর্মিলা বোসের একাত্তরের মূমুর্ষ ‘রেকনিং’ যখন তথ্য-উপাত্তের অভাবে আর যৌক্তিক প্রতিউত্তরের চাপে ‘ডেড’ হয়ে যাচ্ছে, তখন দেশে এক ধরনের নব্য-শর্মিলাপ্রমীর আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। এরা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’এর মত ‘লড়কে লেঙ্গে শর্মিলাযুদ্ধে নেমেছে।

একাত্তরের চেতনা এমনিতেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসাগুলোর একটি। এজন্যই আলুপত্রিকা কপোর্রেট বাণিজ্যে এই চেতনার ব্যবহার করে, আর জামাত মুক্তিযুদ্ধের পুরস্কারদাতা সাজে। আর এই একাত্তরের সবচেয়ে কৌশলি অপব্যবহার হয় ব্যক্তিস্বার্থে হয় নিজেকে আমিও কম কী’ প্রমাণের জন্য অথবা একাত্তরের চেতনা যারা ধারন করেন তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। শর্মিলাপ্রমীরা এর নতুন সংযোজন। এরা প্রথমে এন্টি-শর্মিলাবোসসেজে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করেন,তারপর সুযোগ বুঝে  এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসহয়ে শর্মিলাবোসপ্রেম প্রকাশ করেন। 

কিন্তু  শুভাশীষ দাশকে কখোনই এই দলের কেউ বলে মনে হয়নি। আর একারনের তার এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসঅবস্থান বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।

নাঈম মোহাইমেনের একটি এন্টি-শর্মিলাবোস লেখার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে তিনি তার এই এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসঅবস্থান প্রকাশ করেছেন। 

একাত্তরের ত্রিশ লক্ষ শহীদেরসংখ্যাটি নিয়ে নাঈমের একটি বক্তব্যকে খন্ডনকরে তিনি তার যুক্তিপালা শুরু করেছেন। নাঈম বলেছেন

In any case, whether the death toll was 3 million or 3,00,000 or less, does that make it any less of a genocide?

আপাত দৃষ্টিতে গোবেচারা ধরনের বক্তব্য মনে হলেও শুভাশীষ তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে এর পেছনের ফন্দিফিকির ঠিকই আবিষ্কার করতে পেরেছেন। ত্রিশ লক্ষ সংখ্যাটির বিষয়ে শুভাশীষের বক্তব্য পরিষ্কার, তিনি বলেছেন 

ত্রিশ লক্ষকে কমিয়ে তিন লক্ষে নিয়ে আসা তাঁদের ইতিহাস বিকৃতির প্রাথমিক ধাপ। এক ধাপে সাতাশ লক্ষ কমে গেলে মন্দ কি! এর পরের ধাপ সংখ্যাটিকে শর্মিলা বসুর কাছাকাছি নিয়ে আসা। তারপর একদিন ঘোষণা করে দেয়া- ১৯৭১ সালে ভায়ে ভায়ে ঝামেলায় দুই পক্ষের প্রায় সমান লোক মারা গেছে। এটা যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার মধ্যেই পড়ে না।

 সমস্যা হলো, নাঈমের যে বক্তব্যের বিরোধীতা শুভাশীষ করছেন, সেই একই বক্তব্য কিন্তু তিনি নিজেও দিয়েছেন! শুভাশীষের নিজের কথায়

এই একই বক্তব্য আমি আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম

কী লিখেছিলেন তিনিসেই লেখায়? তিনি লিখেছিলেন 

আর এটাও বোঝা প্রয়োজন, ত্রিশ লক্ষ কমে এসে তিন লক্ষ হলেও যুদ্ধাপরাধ কোনো অংশে লঘু হয় না।

যেই একই বক্তব্যদেবার জন্য তিনি নাঈমকে আক্রমন করছেন, সেই একই বক্তব্য তিনি নিজে কেন প্রচার করলেন? কারন হিসেবে তিনি লিখেছেন—
 
আমার আন্দাজ ছিল, সংখ্যাটা কোনো এক অদ্ভুত হিসেবে তিন লক্ষ হয়ে গেলেও সেটা গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধকে কোনো অংশে লঘু করবে না।
 দেখা যাবে কোন একদিন শুভাশীষ হয়তো বলবেন, “আমার আন্দাজ ছিল, শর্মিলা বোস-প্রেম জাগ্রত হলেও সেটা গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধকে কোনো অংশে লঘু করবে না।

যাই হোক, এখানে তিনি সেটা মাথায় তখন খেলেনিধরনের গা-বাচানো তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন। নিজের এই ‘তিন লক্ষ তত্বের’ সাফাই গাওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি লিথখেছেন— 

কিন্তু এর পেছনে অন্য অঙ্ক অনেকে মাথায় কষে বসে আছে সেটা মাথায় তখন খেলেনি।

 শুনেছি, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াতেও নাকি অনেক রাজাকার আজকাল “তখন মাথায় খেলেনি” অথবা ‘আমার ঘুম ভাঙ্গায়ে গেল রে প্রাণের কোকিলে’ ধরনের যুক্তি দিয়ে পার পাবার চেষ্টা করছেন।  

শুভাশীষের এই এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসঅবস্থানের আরেকটি যুক্তি হলো, নাঈম কেন তার “এন্টি-শর্মিলাবোসলেখায় আফসান চৌধুরিকে কোট করলেন। এখানে শুভাশীষের বক্তব্য

নাঈম মোহাইমেন শর্মিলা বসুর গবেষণা ও প্রোপাগান্ডার সমালোচনা করেছেন-সেটা ঠিক আছে। তবে মাঝে মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আফসান চৌধুরির মতো লেখককে বারংবার উল্লেখ করেছেন। ফলে তাঁর উদ্দেশ্যের মধ্যে সাধুতা কতোটুকু সেটা নিয়ে সন্দেহ হয়।
 নাঈম কিন্তু কোথাও দাবী করেননি যে তিনি আফসান চৌধুরির সব লেখা আর মতের সাথে একমত। কিন্তু তারপরও আফসান চৌধুরির ‘আপত্তিকর’ একটি লেখাকে কোট করে (যা নাঈম নিজে কোট করেননি), তারপর তার সাথে দৈবভাবে নাঈমকে জড়ানোর যে প্রচেষ্টা শুভাশীষ নিলেন, তা অসাধারন! কারো কোন কথা কোট করলে যদি সেই ব্যক্তির যাবতীয় কথার দায় ঘাড়ে নিতে হয়, তাহলে গবেষণা আর সাহিত্যই উঠিয়ে দিতে হবে এদেশ থেকে (রাজাকারের অবশ্য সেই চেষ্টাও করেছিল)।

শুভাশীষ নিজেও কি এ পর্যন্ত যাদের কথা কোট করেছেন বিভিন্ন লেখায়, তাদের সবার সকল কর্ম-কথার দায় নিতে রাজী আছেন?

শুভাশীষ আরও লিখেছেন 

মোহাইমেন আফসান চৌধুরির বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন সেটা তাঁর এই লেখা পড়ে বোঝা যায়। চৌধুরি সাহেবের নানা ইতিং-বিতং কথা লেখাটাতে আসলেও তাঁর মূল আবিষ্কারের উল্লেখ এই লেখায় নাই।

কী সেই “মূল আবিষ্কার”?

শুভাশীষ নিজেই তা বলছেন—
 
আফসান চৌধুরি তাঁর লেখায় একাত্তরে পাকিস্তানিদের ধর্ষণ সম্পর্কে একটা অশ্লীল আবিষ্কারের ইঙ্গিত করেছিলেন।
 অর্থাৎ, শুভাশীষের কাছে আফসান চৌধুরীর অন্যান্য লেখাকে “ইতিং-বিতং” মনে হলেও “ধর্ষণ সম্পর্কে একটা অশ্লীল আবিষ্কারের ইঙ্গিত”-কে মনে হলো “মূল আবিষ্কার”!   আর এই মানষিকতা নিয়েই তিনি বলতে পারেন—
 
“ভিন্ন ন্যারেটিভের নাম করে মিথ্যাচারীদের সংখ্যা কম- এই কথা জোর গলায় বলা যায় না”।
সম্ভবত মিথ্যাচারীদের তালিকায় নিজেকে যোগ করে হিসেব করছেন বলেই সংখ্যাটি শুভাশীষের কাছে বেশি মনে হচ্ছে।  

যতই হিসেব করুন না কেন, শতকোটি বাঙালীর এই দেশে প্রো-শর্মিলাবোসআর  “এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসনিতান্তই হাতে গোনা। এই ক’জনের মোকসুদিয় ত্যানা-প্যাচানি যুক্তি দিয়ে আর যাই হোক, এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোসঅবস্থান শক্ত করা যাবে না!   

শর্মিলাবোসের ‘ডেড রেকনিং’ আর শুভাশীষের এন্টি এন্টি-শর্মিলাবোস অবস্থান ইতিহাসের আস্তাকুড়ে বিস্মৃত দম্পতির মতো যতোই সহবাস করুক, এর থেকে সত্যের জন্ম হবে না।

3 Responses

Subscribe to comments with RSS.

  1. Rumi said, on September 9, 2011 at 10:01 am

    সাধু সাধু

  2. Why Tareque Masud will be missed « Mukti said, on September 12, 2011 at 12:24 pm

    […] I cannot think of anyone else in today’s Bangladesh who wants work on these issues.  For us, history is a few days in 1971, and anyone even daring to look beyond — in either direction — is a closet razakar.  […]

  3. ঢাকাশহর said, on September 19, 2011 at 4:41 am

    এই মাত্র চোখে পরলো। সেই রকম লেখা।


Comments are closed.

%d bloggers like this: